অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর:-
১। ডাকাতের মায়ের ঘুম পাতলা হতে হয় কেন ?
উ:- রাত-বিরেতে কখন সৌখীর মায়ের ঘরের দরজায় টোকা পড়ে তার ঠিক নেই তাই ডাকাতের মায়ের ঘুম পাতলা হতে হয়।
২। সৌখীর বাপের দলের একজন পুলিশের হাতে ধরা পড়বার পর নিজের হাতে জিভ কেটে ফেলেছিল কেন ?
উ:- কারণ- সৌখীর বাপের দলের কারো সম্বন্ধে পুলিশের কাছে যাতে কিছু না বলতে পারে সেই কারণে।
৩। সৌখীর এবারকার বউটার শরীর ভেঙে গিয়েছে কেন ?
উ:- সৌখীর ছেলে হবার পর তার বউয়ের শরীর ভেঙে পড়েছিল।
৪। একবার সৌখী তার মাকে খুব মেরেছিল কেন ?
উ:- একবার সৌখী রাতে বাড়ি ফিরে দরজায় টোকা মেরেও মায়ের ঘুম ভাঙেনি, তাই সে তার মাকে খুব মেরেছিল।
৫। হাতি পাঁকে পড়লে ব্যাঙেও লাথি মারে’- এর অর্থ কী ?
উ:- শক্তিশালী ব্যাক্তি কোনো বিপদে পড়লে তাকে নিয়ে দুর্বলেরা মশকরা শুরু করে।
৬। পুলিশ দেখে ভয় পাওয়ার লোক সে নয়’ – কার কথা বলা হয়েছে ?
উ:- সৌখীর মায়ের কথা
৭। সৌখী ৯০ টাকা রোজগার করে এনেছে কীভাবে ?
উ:- জেলখানার গুদামে কাজ করে জেলের ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৯০ টাকা রোজগার করে এনেছে।
৮। দু-তিন মাস সাজা হয় কাদের ?
উ:- কদুচোর’দের।
৯। সে পাঁচিল ভাঙতে বুড়ির বিশেষ অসুবিধা হল না’- কারণ ?
উ:- পাঁচিলটি দুই-আড়াই ফুট উঁচু করা হয়েছে এবং পাঁচিলের নিচে মাটি-ইট পড়ে থাকায় বুড়ির পাঁচিল ভাঙতে অসুবিধা হয়নি।
১০। সৌখীর মা আগে কী ছিল ?
উ:- ডাকাতের বউ।
১১। আগের বউটার শরীর কেমন ছিল ?
উ:- ভালো ছিল।
১২। বুড়ি বাড়ি বাড়ি গিয়ে কী বেচে ?
উ:- খই-মুড়ি
১৩। লোটা বাড়ির কী ?
উ:- লক্ষ্মী
১৪। সৌখী কত বছর জেলে গেছে ?
উ:- পাঁচ বছর।
১৫। এর আগে সৌখীর কতবার কয়েদ হয়েছে ?
উ:- দু-বার।
১৬। সৌখী জেলখানায় কাদের সঙ্গে কথা বলে না ?
উ:- কদুচোরদের সঙ্গে।
১৭। মেয়ে মানুষকে নিয়ে টানাটানি করছেন কেন’- কে কাকে বলেছে ?
উ:- সৌখী, দারোগাবাবুকে বলেছিল।
১৮।বুড়ি কার পায়ের উপর মাথা কুটছিল ?
উ:- দারোগাবাবুর পায়ের উপর।
১৯। নতুন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েও সৌখীর মায়ের ঘুম আসছিল না কেন ?
উ:- কারণ পরদিন সকালে সৌখীকে কী খেতে দেবে এই চিন্তায়।
২০। বুড়ি নতুন কম্বল কোথায় পেয়েছে ?
উ:- সৌখী দিয়েছিল।
২১। চোরাই মাল জেনেই কিনেছিস’ – চোরাই মালটি হলো--------?
উ:- লোটা।
২২। সৌখীর মা সৌখীর দলের অনুচরদের সম্পর্কে কী বলেছে ?
উ:- তার ছেলের দলের অনুচররা ছিঁচকে চোর,তালপাতার সেপাই।
২৩। সৌখী মেয়াদ শেষের আগেই জেল থেকে বাড়ি ফিরেছিল কেন ?
উ:- সৌখীর কাজ দেখে লাটসাহেব খুশি হয়েছিলেন, তাছাড়া হেড জমাদার সাহেবকে সৌখী টাকা খাইয়েছিল।
২৪। সৌখী যখন ঘরে ফেরে তখন সৌখীর স্ত্রী-পুত্র কোথায় ছিল ?
উ:- সৌখীর শ্বশুর বাড়ি।
২৫। গল্পে উল্লিখিত গন্ধগোকুল আসলে কী ?
উ:- খট্টাশজাতীয় প্রাণী।
২৬। টকটক করে দু’টোকার শব্দ থেমে থেমে তিনবার হলে কী বুঝতে হবে ?
উ:- সৌখীর দলের লোক টাকা দিতে এসেছে।
২৭। এর আগেরবার সৌখী জেল থেকে কী এনেছিল ?
উ:- একখানা কম্বল।
২৮। জেলে থাকাকালীন সৌখীর ডিউটি কোথায় ছিল ?
উ:- জেলখানার গুদামে।
২৯। সৌখী এর আগে কতবার জেল খেটেছে ?
উ:- দু-বার।
৩০। সৌখী বাটুয়াটা কোথায় রেখে গিয়েছিল ?
উ:- খাটিয়ার উপর।
৩১। দিনকাল পড়েছে অন্যরকম’—একথা বলার কারণ কী ?
উ:- সৌখীর মা এই উক্তিটি করেছে।পুলিশকে ঠেকানো যায় কিন্তু দলের লোকদের বিশ্বাস করা যায় না। ক্ষমতার লোভে তারা যেকোনো কাজ করতে পারে। দলের অনুচররা আজকাল তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।
৩২। হায়-রে কপাল’—কার কপালের কথা বলা হয়েছে ?
উ:- এখানে সৌখীর দ্বিতীয় পত্নীর কথা বলা হয়েছে। কেননা রোগা শরীর নিয়ে সে অন্যের বাড়িতে খাটতে পারে না।
৩৩। সৌখীর মা-বউকে কী কেউ বিশ্বাস পায়!’—কোন প্রসঙ্গে এই উক্তি করা হয়েছে ?
উ:- সৌখীর মা এই উক্তি করেছে। যেহেতু সৌখী ডাকাত দলের সঙ্গে যুক্ত সেজন্য কেউ সৌখীর মা-বউকে বিশ্বাস করে না। একারণে লোকের বাড়িতে তাদের কাজও জোটে না।
৩৪। ঘুম আর আসতে চায় না’—ঘুম না আসার কারণ কী ?
উ:- সৌখী বহুরাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকে। তার ছেলে কড়া মেজাজের। সৌখীর মা ঘুমিয়ে পড়লে ছেলে অশান্তি করবে ভেবে সৌখীর মায়ের ঘুম আসতে চায় না।
৩৫। প্রতি মুহূর্তে বুড়ি এই প্রশ্নেরই ভয় করছিল’—বুড়ি কে? সে কেন ভয় করছিল ?
উ:- ডাকাতের মা’ গল্পের বুড়ি হলো সৌখীর মা। সৌখী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি এসে তার বউ-ছেলেকে না দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করবে যে তার বউ-ছেলে কোথায় গিয়েছে। প্রতি মুহূর্তে বুড়ি এই প্রশ্নেরই ভয় করছিল।
৩৬। তার বাড়ি ফিরবার আনন্দ অর্ধেক হয়ে গিয়েছে’—এখানে কার কথা বলা হয়েছে? তার আনন্দ অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল কেন ?
উ:- এখানে সৌখীর কথা বলা হয়েছে। সৌখী বাড়ি ফিরে তার বউ-ছেলেকে না দেখতে পেয়ে তার আনন্দ অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল।
৩৭। সেই হয়েছে বুড়ির মস্ত ভাবনা’—ভাবনার কারণ কী ?
উ:- ভাবনা সৌখীর মায়ের। সৌখী অনেকদিন পর জেল থেকে রাত্রিবেলায় বাড়ি এসেছে। পরদিন সকালে সৌখীকে কী খেতে দেবীই নিয়ে বুড়ির মস্ত ভাবনা।
৩৮। সৌখী তার মাকে বেদম মেরেছিল কেন ?
উ:- একবার সৌখী রাত-দুপুরে বাড়ি এসে দরজায় টোকা মেরেছিল। কিন্তু কোনো শব্দ না পেয়ে সৌখী তার মাকে বেদম মেরেছিল।
৩৯। ডাকাতের মায়ের ঘুম পাতলা না হলে চলেনা কেন ?
উ:- কারণ রাত-বিরেতে সৌখী ও তার দলের লোক এসে দরজায় টোকা মারতে পারে।
৪০। বুড়ির বুক কেঁপে উঠল’—কেন?
উ:- সৌখীর মা মাতাদিন পেশকারের বাড়ি থেকে লোটা চুরি করে বাজারে চোদ্দ আনায় বিক্রি করেছিল।ফলে পরদিন সকালে বাড়িতে দারোগা-পুলিশ আসতে দেখে বুড়ির বুক কেঁপে উঠেছিল।
৪১। সৌখীর কত পয়সায় লোটা বিক্রি করেছিল ?
উ:- চোদ্দো আনা পয়সায় লোটা বিক্রি করেছিল।
৪২। বুড়ির বিশেষ অসুবিধা হলো না’—অসুবিধা হলো না কেন ?
উ:- মাতাদিন পেশকারের বাড়িতে যে পাঁচিল গাথা হচ্ছিল সেই পাঁচিলের নিচে মাটি ও ভাঙা ইট পড়েছিল তাই সেই পাঁচিল টপকাতে বুড়ির বিশেষ অসুবিধা হয়নি।
৪৩। সারা পাড়ায় কিসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল ?
উ:- পোড়া আলু চচ্চড়ির গন্ধ।
৪৪। তখন ত মাথা হেঁট হয়নি তার’—কখন মাথা হেঁট হয়নি ?
উ:- পাঁচ-সাত বছর আগে একবার পুলিশ ভোররাত্রে সৌখীর বাড়ি ঘেরাও করেছিল, বন্দুকের খোঁজে। সেই সময় সৌখীর মায়ের মাথা হেঁট হয়নি।
প্রশ্ন ১: ‘মা তখনো মেঝেতে পড়ে ডুকরে কাঁদছে’ – প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কাঁদার কারণ উল্লেখ করো।
কথামুখ: ঔপন্যাসিক সতীনাথ ভাদুড়ীর অন্যতম একটি গল্প হলো ‘ডাকাতের মা’। এই গল্পে সৌখীর মায়ের সামান্য ভুল সিদ্ধান্তে আনন্দ কিভাবে দুঃখে পরিণত হয় তার পরিচয় রয়েছে।
প্রসঙ্গ: সৌখীর মা মাতাদিন পেশকারের বাড়ি থেকে লোটা চুরি করেছিল। অথচ সেই চুরির দায় পড়েছিল সৌখীর উপর।সৌখীকে দারোগা সাহেব ধরে নিয়ে যাবার সময় তার মায়ের অবস্থা প্রসঙ্গে এই উক্তিটি করা হয়েছে।
কাঁদার কারণ: দীর্ঘদিন পর সৌখী বাড়ি ফিরেছে। ছেলেকে কী খাওয়াবে এই চিন্তায় সৌখির মা সারারাত চোখের দুটি পাতা এক করতে পারেনি। ছেলের পছন্দের খাবার ছিল ‘আলু চচ্চড়ি’, সে প্রসঙ্গে সৌখীর মায়ের ভাবনা এইরকম:
“আলু, চাল, সরষের তেল সবই কিনতে হবে। অত পয়সা পাব কোথায়?”
--এই চিন্তায় সৌখীর মা মাতাদীন পেশকারের বাড়ি থেকে একটি লোটা চুরি করে।
মাতাদিন পেশকারের সঙ্গে দারোগা পুলিশের গভীর সখ্যতার সম্পর্ক। এই কারণে খুব তাড়াতাড়িই সৌখীর বাড়িতে পুলিশ হাজির হয়। দারোগা সাহেবের প্রশ্নের জবাবে সৌখীর মা একটি কথাও বলতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সৌখী যখন মায়ের চুরির অপবাদ নিজের মাথায় নিল, তখন সৌখীর মা ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। দীর্ঘদিনের গর্ব এক মুহূর্তে যেন খান খান হয়ে যায়, যখন লোটা চুরির কলঙ্ক সৌখীর কাঁধে চাপে। যে ছিঁচকে চোরদের সৌখীর মায়ের পছন্দ হয়না, সেই ছিঁচকে চুরির অপবাদেই সৌখীর জেল হবে জেনে মায়ের সমস্ত অহংকার ধূলিস্যাৎ হয়। এই কারণেই দর্পচূর্ণের অবসানে সৌখীর মা কান্নায় ভেঙে পড়ে।
প্রশ্ন ২: ‘ছেলের নামে কলঙ্ক এনেছে’ – কে ছেলের নামে কলঙ্ক এনেছে? কলঙ্ক শব্দটি ব্যবহারের কারণ কী?
কথামুখ: ঔপন্যাসিক সতিনাথ ভাদুড়ীর অন্যতম একটি গল্প হলো ‘ডাকাতের মা’। এই গল্পে সৌখীর মায়ের সামান্য ভুল সিদ্ধান্তে আনন্দ কিভাবে দুঃখে পরিণত হয় তার পরিচয় রয়েছে।
প্রথম অংশ: আলোচ্য গল্পের প্রধান চরিত্র ‘ডাক্কাতের মা’ অর্থাৎ সৌখীর মা তার ছেলে সৌখীর নামে কলঙ্ক এনেছে।
দ্বিতীয় অংশ: বহুদিন পর পুত্র সৌখী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মায়ের সামনে উপস্থিত হয়। সেই সময় সৌখীর মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। কিন্তু পুত্রকে কখনোই নিজের দারিদ্র্যের কথা জানতে দেয়নি। আবার জেল-ফেরত ছেলেকে ‘আলু চচ্চড়ি’ ভাত খাওয়াতে তাকে ছিঁচকে চোরের মতো মর্যাদা হানিকর কাজেও হাত দিতে হয়েছিল।
চরম এক অসহায় মুহূর্তে সৌখীর মা বাধ্য হয়ে পেশকারের গৃহ থেকে পুরোনো একটি লোটা চুরি করেছিল। সেটি চোদ্দ আনায় বিক্রিও করেছিল। এই কলঙ্ক পরে ছেলের নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
ডাকাতের বউ, ডাকাতের মা বলে যার গর্ব ছিল, সে কিনা ছিঁচকে চোরের মতো হীন কাজ করে বসলো। তার ফলে লজ্জায়, দুঃখে তার মাথা হেঁট হয়ে যায়। এর আগে কখনোই দারোগা পুলিশের কাছে মাথা হেঁট করেনি। তার চেয়েও বড়ো কষ্ট তার ছেলের উপর কলঙ্ক লেপন করা। আর সেই বেদনায় সৌখীর মা বুক ভরা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
প্রশ্ন ৩: ‘এইবার সৌখীর মা ভেঙে পড়ল’ – কখন এবং কেন সে ভেঙে পড়েছিল?
কথাকার সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ডাকাতের মা’ গল্প থেকে আলোচ্য অংশটি গৃহীত হয়েছে।
প্রথম অংশ: সৌখীর মা পেশকার সাহেবের বাড়ি থেকে লোটা চুরি করার ফলে তার বাড়িতে দারোগা সাহেব এসেছিল সৌখীকে ধরতে। এর ফলে সৌখীর নামে কলঙ্ক হওয়ায় সৌখীর মা ভেঙে পড়েছিল।
দ্বিতীয় অংশ: বহুদিন পর সৌখী জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাড়িতে আসে, এইজন্য তার মা আনন্দে ভরপুর হয়ে ওঠে। সৌখীর মায়ের অভাব সত্ত্বেও পরদিন ছেলেকে কী খেতে দেবে –এই চিন্তায় তার মায়ের সারা ঘুম আসে না।
এই অভাব-অনটনের মধ্যে তার মা সেই রাত্রে পেশকার সাহেবের বাড়ী থেকে লোটা চুরি করে। সেই লোটাটিকে চোদ্দ আনায় বিক্রি করে। এরফলে পরদিন সকালে সৌখীর বাড়িতে পুলিশ আসে সৌখীকে ধরতে। ছেলের নামে কলঙ্ক আনাটা তার মায়ের কাছে শোক বার্তা বয়ে এনেছিল। সৌখীর মা ভাবছিল যে, শেষকালে ছিঁচকে চুরির অপরাধে কিনা জেলে যাবে। এই সবের ফলে সৌখীর মা ভেঙে পড়েছিল।
প্রশ্ন ৪: ‘ওরা কি ডাকাত দলের যুগ্যি’ – কোন প্রসঙ্গে এই মন্তব্য? বক্তার একথা বলার কারণ বিশ্লেষণ কর।
প্রসঙ্গ: নিজের স্বামী ও ছেলের চেহারা সম্পর্কে সচেতন গল্পের মূল চরিত্র সৌখীর মা। স্বাস্থ্যহীন কালিঝুলি মাখা, রোগাপাতলা ছেলেকে দেখে এই মন্তব্য করেছে সৌখীর মা।
একথা বলার কারণ কী: ডাকাতের মা হিসাবে সৌখীর মায়ের গর্ব ছিল। তার দলের ছেলেরা অবশ্য শেষপর্যন্ত আনুগত্য স্বীকার করেনি। তারা সৌখীর মা-বউ –এর কথা একবারও ভাবেনি। এদেরকে সৌখীর মা চিহ্নিত করেছে ‘বদ-লোক’ বলে। তার বক্তব্য—
“আসতে দাওনা সৌখীকে! দলের ওই বদলোক গুলোকে ঠান্ডা করতে হবে”।
প্রসঙ্গক্রমে সৌখীর মা আরো বলেছে, “এসব একলষেঁড়ে লোকদের দলে না নিলেই হয়”।
সৌখীর মায়ের এইরকম সিদ্ধান্তের কারণ হলো—
এক—এদের চেহারা ডাকাতের সঙ্গে মানানসই নয়।
দুই—দেখতে অনেকটা তালপাতার সেপাই।
তিন—রোগাপটকাকে দেখে কেউ ভয় পায় না।
সুতারাং সৌখীর মায়ের সিদ্ধান্ত সৌখীর দলের লোকেরা কেউ ডাকাত দলের যোগ্য নয়।
প্রশ্ন ৫: জেল থেকে ফিরে আসার দিন রাত্রে সৌখীর সঙ্গে তার মায়ের যে কথোপকথন হয়েছে তা গল্পানুসরনে লেখ।
ভূমিকা: সতীনাথ ভাদুড়ির ‘ডাকাতের মা’ গল্পে দেখা যায়, জেল থেকে সৌখীর ফিরে আসার দিন রাত্রে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিল তার মা। ছেলের বাড়ির ফেরার আনন্দে তার মা অভিভূত। তাদের দুজনের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল তা মা-ছেলের সম্পর্কের দিক তুলে ধরে।
কথোপকথন: অনেক রাতে সৌখী বাড়ি ফিরেছিল। মাকে সৌখী জানায়, হেড জমাদার সাহেবকে টাকা খাইয়ে সে ছাড়া পেয়েছে।
সৌখী দরকারের চাইতেও যেন বেশি জোরে কথা বলছিল। কেননা সে তার পত্নী ও সন্তাকে খুঁজছিল। ছেলের এই ঔৎসুক্য সম্পর্কে সৌখীর মা আগে থেকে জানত। লেখক লিখেছেন—“প্রতি মুহূর্তে বুড়ি এই প্রশ্নেরই ভয় করছিল”।
তার ভয়ের কারণ, সৌখী জানতে চেয়েছিল—সে তার ছেলে-বউকে দেখতে পাচ্ছে না কেন? ছেলের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সৌখীর মা জানায়—“মেয়েদের কি মা-বাপকে দেখতে ইচ্ছে করে না একবারও?”
নাতি আর বউমার প্রসঙ্গ থেকে সৌখীর মা অন্য প্রসঙ্গে আসে। সৌখীকে হাত-মুখ ধুয়ে আসতে বলে। সৌখী খেয়ে এসেছে জানালে সৌখীর মা প্রত্যুত্তরে জানায়, “খই মুড়ি আছে। খেয়ে নে। তুই যে কত খেয়ে এসেছিস, সে আর আমি জানিনে”।
--এখানে সৌখীর মায়ের অপত্য স্নেহ ধরা পড়ে। নিজের কম্বলখানা মায়ের গায়ে জড়িয়ে দেয় সৌখী। যদিও নতুন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েও ছেলেকে খাওয়ানোর চিন্তায় তার ঘুম আসে না।
সে রাতে এভাবে সৌখী আর তার মায়ের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল তা আন্তরিক।
প্রশ্ন ৬: দারোগা পুলিশ দেখে বুড়ির বুক কেঁপে উঠল কেন?
‘ডাকাতের মা’ গল্পে সৌখীর মা বেশ সাহসী ছিল। তার স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে তার বেশ গর্ব ছিল। তার দুটি পরিচয়—
এক) সে ডাকাতের বউ
দুই) সে ডাকাতের মা
সুতরাং, তার ভয় ছিল না। জীবনে বহু ঘটনার সাক্ষী সে। পুলিশ-দারোগা নিয়ে তার কোনো ভীতিবোধ নেই। তার স্বামীকে সবাই মান্য করত। কিন্তু মাতাদীন পেশকারের বাড়ি থেকে লোটা চুরি করাটা গর্বের বিষয় ছিল না।
তাই বাসনওয়ালা, পেশকার সাহেব ও দারোগাকে দেখে সৌখীর মায়ের বুক কেঁপে উঠেছিল। সতীনাথ লিখেছেন—
“পুলিশ দেখে ভয় পাবার লোক সে নয়। এর আগে কতবার সময়ে অসময়ে পুলিশকে তাদের বাড়ি হানা দিতে দেখেছে”।
কিন্তু এবার তার ভয়ের কারণ অন্য। ডাকাতি করা তার স্বামী-পুত্রের জীবিকা। এই জীবিকা নিয়ে তার কোনো আফশোস নেই। কেননা—
প্ৰথমত। স্বামী-পুত্রের কাজ ‘মরদের কাজ'।
দ্বিতীয়ত। সে কাজ নিঃসন্দেহে গর্বের কাজ।
কিন্তু সৌখীর মা 'ছিঁচকে চোরের কাজ করেছে। সৌখী কি ভাববে— সেই চিন্তায় তার মা ভয় পেয়েছিল।
প্রশ্ন ৭: 'আগে সে ছিল ডাকাতের বউ। ...তার পরিচয় ডাকাতের মা বলে।'’ –‘ডাকাতের বউ’ কীভাবে ‘ডাকাতের মা’-এ পরিণত হয়েছে, তা দেখাও।
‘ডাকাতের বউ’য়ের ‘ডাকাতের মা’-এ রূপান্তর: নিম্নবর্গের প্রাত্যহিক দিনযাপনের চিত্র অঙ্কনে ক্লান্তিহীন সতীনাথের ‘ডাকাতের মা’ গল্পটি নানা কারণে বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য।
সতীনাথ ভাদুড়ী সৌখীর মায়ের চরিত্র অঙ্কনে প্রথমেই তার পাঠককে বলে দিয়েছেন, এই চরিত্রটির একটি বিশেষ পরিচয় রয়েছে—
“আগে সে ছিল ডাকাতের বউ। সৌখীর বাপ মরে যাবার পর থেকে তার পরিচয় ডাকাতের মা বলে”।
এরপরেই সৌখীর মায়ের কার্যকলাপ বর্ণিত হয়েছে। কীভাবে সে পুলিশের সঙ্গে মোকাবিলা করে, কীভাবেই বা দলের ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে, সে বিষয়গুলি লেখক নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছেন।
স্বামী ও সন্তানের কর্মের সঙ্গে তার জীবন একই সূত্রে বাঁধা পড়েছে। তাই একটা অনুশোচনাবোধ ও আশঙ্কা সবসময় তার মনের মধ্যে লালিত হতে থাকে। সতীনাথ লিখেছেন—
“ঝি-চাকরের কাজও তো আমরা করতে পারি না। করলেই বা রাখতে কে? সৌখীর মা-বউকে কেউ বিশ্বাস পায়!”
অনেকদিন পর ছেলে বাড়ি ফেরার আনন্দে মায়ের বুকের মধ্যে যেভাবে তোলপাড় করে সেই বোধের বিশ্লেষণে সতীনাথ লিখেছেন—
“বুড়ি ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছে।...এ ছেলে বুড়ো হয়েও সেই একইরকম থেকে গেল।...এই আনন্দ আর রাখবার জায়গা নেই”।
সতীনাথ অবশ্য এই চরিত্রের বিবর্তন দেখালেন। বৃদ্ধা মা ছেলেকে খাওয়ানোর চিন্তায় সারারাত দুটি চোখের পাতা এক করতে পারেনি। তার মাথার মধ্যে সর্বক্ষণ ঘুরেছে একটাই মাত্র প্রশ্ন— “সৌখীকে কী খেতে দেবে কাল সকালে সেই হয়েছে বুড়ির মস্ত ভাবনা”।
আর সেই ভাবনা থেকে মাতাদীন পেশকারের বাড়ি থেকে সে চুরি করেছে বহুপ্রাচীন একটি লোটা। আর এতেই ঘটেছে বিপত্তি। সৌখীর কথানুসারে দারোগা যখন সৌখীকে পুনরায় জেলখানার উদ্দেশ্যে নিয়ে চলে সেই মুহূর্তের পরিস্থিতি বর্ণনায় সতীনাথ লিখেছেন—
“মা তখনও মেঝেতে পরে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। উনোনে চড়ানো আলুর তরকারির পোড়া গন্ধ সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে”।
বস্তুত ‘ডাকাতের মা' গল্পের সৌখীর মা ‘ডাকাতের বউ থেকে ‘ডাকাতের মা’-এ পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন ৮: ‘তার বাড়ি ফিরবার আনন্দ অর্ধেক হয়ে গিয়েছে মুহূর্তের মধ্যে।' —এখানে কার কথা বলা হয়েছে? কোন্ প্রসঙ্গে বক্তব্যটি করা হয়েছে? 'বাড়ি ফিরবার আনন্দ' কেন 'অর্ধেক হয়ে গিয়েছে' বলে লেখক জানিয়েছেন?
১) যার কথা বলা হয়েছে: ‘ডাকাতের মা' নামাঙ্কিত বহুখ্যাত গল্পের থেকে উদ্ধৃত এই উক্তিটি গৃহীত হয়েছে। এখানে সৌখীর কথা বলা হয়েছে।
২) প্রসঙ্গ: দীর্ঘদিন কারাবরণের পর সৌখী যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন স্ত্রী ও শিশুপুত্রটিকে না দেখতে পেয়ে তার মনের অবস্থা বর্ণনায় লেখক এই উক্তিটি করেছেন।
৩) 'আনন্দ অর্ধেক হওয়ার কারণ: সতীনাথ ভাদুড়ীর মধ্যে ছিল সর্বব্যাপী ও সুগভীর অস্তদৃষ্টি। ‘ডাকাতের মা’ নামাঙ্কিত গল্পে এক বিশেষ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে একজন যুবকের বিপদগামী হওয়ার আখ্যান লিখেছেন সতীনাথ।
জীবনের বেশিরভাগ সময় সে অন্ধকারের মধ্যে দিন যাপন করেছে। সতীনাথ লিখেছেন—
“সৌখী জেলে গিয়েছে আজ পাঁচ বছর; ... সৌখীরও তো এর আগে দুবার কয়েদ হয়েছে”।
অর্থাৎ কারাগারে থাকাই যেন তার নিত্য রুটিন।
দীর্ঘদিন পর সৌখী যখন বাড়ি ফিরেছিল তখন পত্নী ও পুত্রকে না দেখে তার বাড়ি ফেরার আনন্দ অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি মানুষের মধ্যে রয়েছে তার নিজস্ব ভালোলাগার একটি জগৎ। যতই বিপর্যয় আসুক না কেন মানুষ বেঁচে থাকে একটুকরো স্বপ্ন নিয়ে।
ভাগ্যহীন সৌখীর মধ্যেও সেই স্বপ্নটুকু ছিল। ঘটনা চক্রে সে ডাকাত হলেও এবং দারিদ্র্য তাদের পরিবারে নিত্য সহচর হলেও মানবিক বোধবুদ্ধির বিলুপ্তি ঘটেনি। তাই দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফিরে তার দু’চোখ খুঁজতে থাকে অন্তরঙ্গ মানুষজনদের।
সৌখীর মা জানত তার ছেলে নিঃসন্দেহে জানতে চাইবে ছেলে বউয়ের কথা। ঘটনাচক্রে দেখা যায় কথা প্রসঙ্গে সৌখী তার মাকে প্রশ্ন করেছে তার বউ হঠাৎ বাপের বাড়ি কেন? সতীনাথ লিখেছেন—
“ছেলে ছেলে করে মরে সৌখী। ...শরীর খারাপের কথা শুনলে হয়তো সৌখী এখানে আর একদিনও থাকবে না”।
এতদিন পর বাড়ি ফিরে ছেলে ও বউয়ের মুখ না দেখে সৌখীর বাড়ি ফেরার আনন্দ মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উে যায়। আন্তর্মানবিক সম্পর্কগুলি কীভাবে আমাদের মনের মধ্যে ফল্গুধারার মতো ক্রিয়াশীল থাকে, তা দেখিয়েছেন সতীনাথ ভাদুড়ী।
প্রশ্ন ৯: 'এতক্ষণে বোঝে সৌখী ব্যাপারটা।'—কোন্ ‘ব্যাপারটা'র কথা বলা হয়েছে? সে কীভাবে এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল, তা আলোচনা করো।
১) কোন্ ব্যাপার: আধুনিক আর্থসামাজিক বাস্তব ভারতের প্রেক্ষাপটে লেখা সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ডাকাতের মা’ গল্প থেকে উদ্ধৃত অংশটি গৃহীত হয়েছে। দারোগার সামনে চুরির ঘটনা বিষয়ে একটিও বাক্য ব্যয় করার সাহস দেখায়নি। সৌখী বুঝতে পেরেছিল, তার মা যে কর্মটি করেছে, তা নিঃসন্দেহে গর্হিত কর্ম। সেই প্রসঙ্গে এই মন্তব্য করা হয়েছে।
২) ব্যাপারটি অনুধাবন: সাংসরিক অভাব অনটন যখন চরম পর্যায়ে উঠেছিল তখন পুত্রবধূ ও নাতিকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে মুথাঘাসের মতো কোনোভাবে টিকেছিল সৌখীর মা। ছেলে বাড়ি ফেরায় আনন্দের সঙ্গে বিষাদও সৌখীর মার মন জুড়ে ছিল।
কী খাওয়াবে ছেলেকে?--সেই চিন্তায় অস্থির সৌখীর মা সারারাত চোখের দুটি পাতা এক করতে পারে না। ছেলের পছন্দের খাবার ছিল আলু চচ্চড়ি। সেই প্রসঙ্গে সতীনাথ লেখেন—
“আলু, চাল, সরষের তেল সবই কিনতে হবে। অত পয়সা পাবে কোথায়?”
এই চিন্তায় অস্থির থেকে সৌখীর মা মাতাদীন পেশকারের বাড়ি থেকে একটি লোটা চুরি করে।
ঘটনাচক্রে মাতাদীন সেই লোটা কেনার জন্যে বাসনের দোকানে গিয়ে উপস্থিত হলে গল্পের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। সমস্ত সম্ভ্রমের নিষেধ অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র সন্তানের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখতে সৌখীর মা চৌর্যবৃত্তির পথ বেছে নিয়েছিল।
মাতাদীন পেশকারের সঙ্গে দারোগা-পুলিশের গভীর সখ্যতার সম্পর্ক। ফলে তারা একসঙ্গে গিয়ে হাজির হয় সৌখীর বাড়িতে। দারোগাসাহেবের প্রশ্নের জবাবে সৌখীর মা একটি কথাও বলতে পারে না। ধূর্ত ও মতলবী দারোগার সামনে মায়ের নিশ্চুপ থাকার বিষয়টি সম্পর্কে সতীনাথ লেখেন—
“কোনো জবাব বেরুল না বুড়ির মুখ দিয়ে। শুধু একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে সে মাথা হেঁট করে”।
সৌখী এই সত্য অনুধাবন করে যে, তার মা গত রাতে লোটা চুরি করেছে। সে ডাকাত হলেও তার মাকে নিয়ে তার একটি বিশ্বাসের জগৎ, গর্বের জায়গা ছিল— তা কাঁচের টুকরোর মতো ভেঙে খান খান হয়ে যায়।
প্রশ্ন ১০: 'প্রতি মুহূর্তে বুড়ি এই প্রশ্নের ভয়ই করছিল?’-- ‘বুড়ি’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? তার ভয়ের কারণ কী ছিল?
(১) সতীনাথ ভাদুড়ী প্রণীত 'ডাকাতের মা’ গল্পে ‘বুড়ি’ বলতে সৌখীর মায়ের কথা বলা হয়েছে।
(২) সৌখী দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বাড়ি ফিরেছে। সঙ্গতই তার চোখ ছেলে ও বউকে খুঁজতে থাকবে। এদের কাউকে দেখতে পায়নি। মায়ের কাছে তাই সৌখী জানতে চেয়েছিল—“এদের কাউকে দেখছি না?” সেই প্রসঙ্গে সৌখীর মায়ের অবস্থা নির্ণয়ে এই বক্তব্য উঠে এসেছে।
সৌখী জেলে যাওয়ার পর তার দলের ছেলেরা প্রথমে সাহায্য করত। কিন্তু পরে সৌখীর মায়ের কোনো খবর তারা নেয়নি। এর কারণ বিশ্লেষণে সৌখীর মায়ের মনে হয়েছে—“দিনকাল পড়েছে অন্যরকম!” নাতি ও বউয়ের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সাধ্য সৌখীর মায়ের নেই। রুগ্ন বউকে বাড়িতে রেখেও দেওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে ছেলের শ্বশুর বাড়িতে তাদের পাঠিয়ে দেয়।
ছেলে বাড়ি ফিরে প্রথমে বউ ও বাচ্চার মুখ দেখতে চাইবে। এটাই স্বাভাবিক। তাই সৌখী যখন তার সন্তান ও পত্নীর কথা বলে, তখন তার মা রীতিমতো ভয় পেয়ে যায় ৷
প্রশ্ন ১১:-' ডাকাতের মা' গল্পের নামকরণ আলোচনা করো।
উ:- প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সতীনাথ ভাদুড়ীর 'ডাকাতের মা ছােটোগল্পটি পড়লে আমরা স্পষ্টই দেখতে পাই যে, এই নামকরণ চরিত্রকেন্দ্রিক। কেননা, নামচরিত্রটিই আলোচ্য গল্পের প্রাণচরিত্র।
ডাকাতের মা ছােটোগল্পের প্রয়াত ডাকাত সর্দারের স্ত্রী হল বর্তমান ডাকাত সর্দার সৌখীর মা। পাঁচ বছর আগে ছেলে সৌখী জেলে গেলে এবং তার দুবছর পর সৌখীর অনুচররা টাকা পাঠানাে বন্ধ করে দিলে অসহনীয় দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে এই বৃদ্ধা। নিতান্ত বাধ্য হয়েই শিশু নাতি এবং বউমাকে বেয়াই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে সে নিজে খই-মুড়ি ভাজা বিক্রি করে কোনােক্রমে দিন কাটাতে থাকে সুদিনের আশা বুকে নিয়ে। ছেলে সৌখীর আপত্তির জন্য নাক-মুখ কম্বল ঢেকে না শুতে পারার জন্য রাতে তার ঘুমও ভালাে হয় না। জেল থেকে আগেভাগে ছাড়া পেয়ে হঠাৎই এক রাতে বাড়ি ফেরে সৌখী। ঘরে কিছু না থাকায় মা বিক্রির জন্য রাখা খই-মুড়িই খেতে দেয় ছেলেকে।
রাতে শুয়ে শুয়ে পরদিন সকালে ছেলেকে কী খাওয়াবে— সেই চিন্তায় তার ঘুম হয় না। ছেলেকে তার প্রিয় আলুচচ্চড়ি দিয়ে ভাত খাওয়াতে হলে যে তেল-চাল-আলুর দরকার, তা কেনার মতাে পয়সাও তার নেই। তাই বাধ্য হয়ে মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে পাড়ার মাতাদীন পেশকারের বাড়ি ঢুকে তাদের লােটাটা সে চুরি করে। সকালে বাসনওয়ালার দোকানে সেটা চোদ্দো আনায় বিক্রি করে সেই পয়সায় প্রয়ােজনীয় জিনিস কেনে এবং উনুনে আলুচ্চড়ি চাপায়। কিন্তু পরদিন সকালেই সে পুলিশের কাছে ধরা পড়ে যায়। ডাকাত পরিবারের একজন সদস্যা হয়েও সামান্য ছিচকে চুরির অপরাধে ধরা পড়ে যাওয়ায় লােকলজ্জাজনিত কারণে তার অহংবােধে ঘা লাগে। ঘটনার আকস্মিক অভিঘাতে স্তম্ভিত সৌখীর মা পুলিশের কাছে তার চুরির ঘটনা অস্বীকার করতে পর্যন্ত ভুলে যায়। এদিকে হইহট্টগােলে সৌখীর ঘুম ভেঙে যায়। সে বুঝতে পারে যে, ডাকাত বংশের বউ হয়েও তার মা সামান্য চোদ্দো আনার জন্য ছিচকে চুরি করেছে। বৃদ্ধা মাকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানাের জন্য তাই সে চুরির দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়। বুড়ির কাতর স্বীকারােক্তিতে দারােগাবাবু কর্ণপাত পর্যন্ত করেন না। শােকে-দুঃখে বৃদ্ধা তখন মেঝেতে লুটিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে, আর তার উনুনের তরকারির পােড়া গন্ধ সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
সুতরাং 'ডাকাতের মা' ছোট গল্প নামহীন চরিত্র সৌখী ডাকাতের মায়েরই গল্প। তার চিন্তা-ভাবনা, দুঃখ-কষ্ট, আশা আকাঙ্ক্ষা ও সহানুভূতি নিয়েই আবর্তিত হয়েছে গল্পটি। শেষ পর্যন্ত তারই ভুল পদক্ষেপে কোনাে অপরাধ না করা সত্ত্বেও তার ছেলেকে পুনরায় জেলে যেতে হয়। যেহেতু ডাকাতের মা চরিত্রকে কেন্দ্র করেই গল্পটি আবর্তিত হয়েছে এবং এক বিষাদময় পরিণতির দিকে গল্পটিকে নিয়ে গেছে, তাই এর নামকরণকে আমরা সর্বাঙ্গসুন্দর বলতেই পারি।
প্রশ্ন ১২:- ছােটোগল্প হিসেবে 'ডাকাতের মা' কতটা সার্থক আলােচনা করাে।
উ:- সতীনাথ ভাদুড়ীর 'ডাকাতের মা' গল্পটি ছােটোগল্প হিসেবে নানাভাবে সার্থক হয়েছে।
প্রথমত, এ গল্পে রয়েছে স্থান-কাল-ঘটনার ঐক্য। সৌখীর মায়ের রাত্রিকালীন চিন্তাভাবনা থেকে এই গল্পের শুরু এবং গল্পটি শেষ হয়েছে পরদিন ভােরে সৌখীকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার কাহিনি দিয়ে।
দ্বিতীয়ত, এ গল্পে ইঙ্গিতধর্মী বাক্যের অসাধারণ ব্যবহার দেখা যায়। যেমন, ডাকাতি করা তার স্বামী-পুত্রের হকের পেশা”—এই একটি বাক্যেই ডাকাতি সম্পর্কে সৌখীর মায়ের মানসিকতা ধরা পড়েছে।
তৃতীয়ত, ডাকাতের মা' গল্পে একটি বংশানুক্রমিক ডাকাত পরিবারের নানান ঘটনাকে অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে লেখক তুলে ধরেছেন। সৌখীর মায়ের কথা শুনে তাই মনে হয়, ডাকাতি করা তার কাছে মােটেও কোনাে নিকৃষ্ট কাজ নয়, বরং ছিচকে চুরিই তার থেকে ঢের বেশি লজ্জার।
চতুর্থত, এই গল্পের শেষে রয়েছে নাটকীয়তা। ছেলের খাবারের জন্য পয়সা জোগাড় করার জন্য সৌখীর মায়ের রাতের বেলায় লােটা চুরি করা এবং পরের দিন সকালেই দারােগাবাবুর হাতে সৌখীর গ্রেফতার হওয়া-এই একমুখী ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছে যে, তা পাঠককে শেষপর্যন্ত রীতিমতাে উৎকণ্ঠিত করে রেখেছে, চমকিত করে রেখেছে।
ডাকাতের মা গল্পটিতে বহু চরিত্রের সমাবেশ, ঘটনার ঘনঘটা, অতিকথন, তত্ত্ব ও উপদেশ অনুপস্থিত। ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহতের, খণ্ডের মধ্যে সমগ্রের ইঙ্গিত দিতে দিতে গল্পটি একমুখী লক্ষ্যের দিকেই এগিয়ে গেছে। তাই এটি ছােটোগল্প হিসেবে সার্থক।
প্রশ্ন ১৩ :- 'ডাকাতের মা' ছােটোগল্পের মূল চরিত্র কে—সৌখী না তার মা?
উ:- সতীনাথ ভাদুড়ীর ডাকাতের মা ছােটোগল্পে আমরা সৌখী, সৌখীর মা, মাতাদীন পেশকার, দারােগাসাহেব ও বাসনওয়ালা এই পাঁচটি চরিত্রের সাক্ষাৎ পাই। এদের মধ্যে প্রধান চরিত্র হল সৌখীর মা।
প্রথমত, এই গল্পটি আবর্তিত হয়েছে মূলত সৌখীর মাকে কেন্দ্র করে এবং তার চিন্তাভাবনার সূত্র ধরে। সৌখীর বাপের আমল আর বর্তমান সময়ের ন্যায়নীতির একটি তুলনামূলক আলােচনা, সৌখীর মায়ের সন্তান বৎসলতার জন্য ঘটি চুরি করা, ধরা পড়ে যাওয়া ইত্যাদি গল্পমধ্যে প্রকাশিত যাবতীয় ঘটনা, চরিত্র বা অনুভূতিই আবর্তিত হয়েছে সৌখীর মায়ের হৃদয়ানুভূতিকে কেন্দ্র করে। সেদিক থেকে বিচার করলে সৌখীর মা-ই এই গল্পের মূল চরিত্র।
দ্বিতীয়ত, সাধারণত কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তাকেই নির্বাচন করা হয় যে সমস্ত 'doing' ও 'suffering' -এর মূল লক্ষ্য। ছেলে। জেলে যাওয়ার পর অর্থের অভাবে খই-মুড়ি বিক্রি করে নিজের পেট চালানাে থেকে নাতিবউমাকে বাধ্য হয়েই বেয়াই বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া, বহুদিন পর ছেলে জেল থেকে ছাড়া পেলেও ছেলেকে পছন্দের আলুচচ্চড়ি খাওয়াতে না-পারা, তার একটি ভুল পদক্ষেপের জন্য তার চুরির দায় নিয়ে ছেলের পুনরায় পুলিশের সঙ্গে থানায় যাওয়া, সামান্য ছিচকে চুরির ঘটনায় ছেলের জেল হওয়ায় তার অহংবােধে যে আঘাত লাগে তা কিছুতেই সেরে ওঠার নয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, সৌখীর মাই এই গল্পের মুখ্য চরিত্র। এই 'suffering' তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
